উসমান (রা.) — তৃতীয় খলিফা
Caliphate of Uthman
সংক্ষিপ্ত বিবরণ
কুরআনের আনুষ্ঠানিক সংকলন ও প্রমিত পাঠ নির্ধারণ। নৌবাহিনী গঠন। উত্তর আফ্রিকা ও সাইপ্রাস বিজয়। অভ্যন্তরীণ ফিতনায় শহীদ হন।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
কুরআনের আনুষ্ঠানিক সংকলন — ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের একটি।
📖 বিস্তারিত ইতিহাস
হযরত উমর (রা.)-এর শাহাদাতের পর শুরা কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) তৃতীয় খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত লাজুক, নম্র এবং দানশীল। নবীজি (সা.)-এর দুই কন্যাকে (রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুম) বিয়ে করার কারণে তাঁকে 'জুন-নুরাইন' (দুই নূরের অধিকারী) বলা হয়।
তাঁর ১২ বছরের খিলাফতকালকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ৬ বছর ছিল শান্তি, সমৃদ্ধি ও বিজয়ের। আর শেষ ৬ বছর ছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ফিতনার। তাঁর শাসনামলে ইসলামী সাম্রাজ্য পূর্বে আফগানিস্তান ও খোরাসান এবং পশ্চিমে মরক্কো পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আর্মেনিয়া, আজারবাইজান এবং সাইপ্রাস দ্বীপ বিজিত হয়।
উসমান (রা.)-এর সবচেয়ে বড় এবং চিরস্থায়ী অবদান হলো পবিত্র কুরআনের সংকলন ও প্রমিতকরণ। ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে অনারব মানুষেরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে এবং কুরআনের উচ্চারণে বিভিন্ন আঞ্চলিক টান ঢুকে পড়ে। হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) আর্মেনিয়া সীমান্তে জিহাদ করার সময় লক্ষ্য করেন যে মুসলিমরা কুরআনের পঠন নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হচ্ছে।
এই সংবাদ শুনে উসমান (রা.) দ্রুত পদক্ষেপ নেন। তিনি জায়েদ বিন সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত মূল পাণ্ডুলিপি (যা আবু বকরের সময় সংকলিত হয়েছিল) থেকে নকল করে কুরআনের প্রমিত কপি তৈরি করা হয়। কুরাইশদের উপভাষায় একে মানদণ্ড ধরা হয়। এরপর এই প্রমিত কপিগুলো মক্কা, মদীনা, কুফা, বসরা, দামেস্ক ও ইয়েমেনে পাঠানো হয় এবং অন্য সব ব্যক্তিগত বা আঞ্চলিক কপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। এভাবেই কুরআন বিকৃতি থেকে রক্ষা পায়।
উসমান (রা.)-এর আরেকটি বড় কৃতিত্ব হলো প্রথমবারের মতো শক্তিশালী মুসলিম নৌবাহিনী গঠন। মুয়াবিয়া (রা.)-এর পরামর্শে তিনি ভূমধ্যসাগরে রোমানদের মোকাবেলা করার জন্য নৌবহর তৈরির অনুমতি দেন। সাইপ্রাস বিজয় এবং 'জাওয়ারিস' যুদ্ধে রোমান নৌবাহিনীর পরাজয় ছিল এই নৌবাহিনীর বড় সাফল্য। তিনি মসজিদে নববী এবং মসজিদুল হারামের বিশাল সম্প্রসারণও করেন।
তবে তাঁর খিলাফতের শেষ দিকে কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলে। তিনি তাঁর আত্মীয়দের (বনু উমাইয়া) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিলেন, যদিও তাঁরা যোগ্য ছিলেন। বিদ্রোহীরা মদীনা অবরোধ করে। উসমান (রা.) রক্তপাত এড়াতে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে অস্বীকৃতি জানান। ৩৫ হিজরিতে (৬৫৬ খ্রি.) বিদ্রোহীরা তাঁর বাড়িতে ঢুকে তাঁকে নির্মমভাবে শহীদ করে। তখন তিনি কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর রক্ত কুরআনের পাতায় ছড়িয়ে পড়ে।
উসমান (রা.)-এর শাহাদাত ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বড় গৃহযুদ্ধের (ফিতনা) সূচনা। এই ঘটনা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে যে ফাটল ধরিয়েছিল, তা আর কখনোই পুরোপুরি জোড়া লাগেনি।
প্রধান ব্যক্তিবর্গ
উসমান ইবনে আফফান (রা.)
Uthman ibn Affan
তৃতীয় খলিফা, কুরআনের সংকলক ও শহীদ
মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)
Muawiyah ibn Abu Sufyan
সিরিয়ার গভর্নর ও নৌবাহিনী গঠনের প্রস্তাবক
জায়েদ বিন সাবিত (রা.)
Zayd ibn Thabit
কুরআন সংকলন কমিটির প্রধান
📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
উসমান (রা.) এর খিলাফত লাভ
কুরআনের প্রমিত কপি সংকলন ও বিতরণ
বিদ্রোহীদের হাতে উসমান (রা.) এর শাহাদাত
💡 শিক্ষা ও উপদেশ
- কুরআন সংরক্ষণ — উসমান (রা.) এর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত আজ আমাদের হাতে অবিকৃত কুরআন পৌঁছে দিয়েছে।
- রক্তপাত এড়ানোর চেষ্টা — নিজের জীবন দিয়েও তিনি মুসলিমদের হাতে মুসলিম হত্যার পথ খুলতে চাননি।
- ফিতনা বা বিশৃঙ্খলার ভয়াবহতা — একবার ফিতনা শুরু হলে তা থামানো কঠিন।
📜 কুরআনের রেফারেন্স
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।
— সূরা হিজর ১৫:৯