উমর (রা.) — দ্বিতীয় খলিফা
Caliphate of Umar
সংক্ষিপ্ত বিবরণ
ইসলামী সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার। পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়। জেরুজালেম বিজয়। বায়তুল মাকদিসে প্রবেশ। প্রশাসনিক ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, সামরিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা। হিজরি পঞ্জিকা চালু।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ন্যায়বিচার ও সুশাসনের অনুপম উদাহরণ। ইসলামের দ্রুতগতিতে বিস্তার।
📖 বিস্তারিত ইতিহাস
৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে আবু বকর (রা.) এর ইন্তেকালের পর উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর ১০ বছরের শাসনামলকে ইসলামের 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়। তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারের মূর্ত প্রতীক — তাঁর উপাধি ছিল 'ফারুক' (সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী)। তাঁর সময়ে ইসলামী সাম্রাজ্য অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বিস্তার লাভ করে — পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং মিশর, ফিলিস্তিন, ইরাক ও ইরান মুসলিমদের দখলে আসে।
উমর (রা.) কেবল একজন বিজেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য প্রশাসক। তিনি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনেক মৌলিক কাঠামোর জনক। তিনি প্রথম 'হিজরি সাল' প্রবর্তন করেন। বাইতুল মাল (Treasury), নিয়মিত সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, জজ (কাজী) নিয়োগ, এবং ডাক বিভাগ চালু করেন। তিনি আদমশুমারি (Census) করান এবং শিশু, বৃদ্ধ ও অমুসলিম নাগরিকদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি: 'ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তবে কিয়ামতের দিন উমরকে সে জন্য জবাবদিহি করতে হবে।'
ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কঠোর। তাঁর নিজের ছেলে মদ্যপানের অপরাধে দন্ডিত হলে তিনি তাকেও শাস্তি দেন। মিশরের গভর্নরের ছেলের বিরুদ্ধে এক সাধারণ কিবতি (খ্রিস্টান) অভিযোগ করলে, তিনি গভর্নরকে ডেকে পাঠান এবং কিবতিকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ দেন। জেরুজালেম বিজয়ের সময় তিনি ভৃত্যের সাথে পালা করে উটে চড়ে যান — শহরে ঢোকার সময় ভৃত্য উটের পিঠে আর খলিফা উটের রশি ধরে হাঁটছিলেন। খ্রিস্টান পুরোহিতরা এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে চাবি হস্তান্তর করেন।
১৮ হিজরিতে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (রামাদা বর্ষ) দেখা দেয়। উমর (রা.) তখন ঘি ও মাংস খাওয়া ছেড়ে দেন এবং সাধারণ মানুষের মতো জলপাই তেল ও রুটি খেয়ে জীবনযাপন করেন। তিনি বলতেন: 'প্রজারা না খেয়ে থাকলে আমার ভালো খাবার খাওয়ার কী অধিকার?' তিনি রাতের আঁধারে ছদ্মবেশে মদীনার গলিতে ঘুরতেন (পাহারাদারি করতেন) যাতে কেউ কষ্টে না থাকে।
পারস্য জয়ের পর কাদিসিয়া ও নিহাওয়ান্দ যুদ্ধের মাধ্যমে সাসানীয় সাম্রাজ্য পুরোপুরি মুসলিমদের অধীনে আসে। রোমানদের হারিয়ে ইয়ারমুক যুদ্ধের মাধ্যমে সিরিয়া বিজিত হয়। আমর ইবনুল আস (রা.) এর নেতৃত্বে মিশর জয় হয়। এতো বিশাল বিজয়ের পরও উমর (রা.) মদীনার খেজুর পাতার মসজিদে জীর্ণ পোশাকে শুয়ে থাকতেন। রোমান দূত এসে তাঁকে দেখে অবাক হয়ে বলেছিল: 'আপনি ন্যায়বিচার করেছেন, তাই আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছেন। আমাদের রাজারা অবিচার করে, তাই তারা ভয়ে থাকে।'
৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে নববীতে ফজরের নামাজ পড়ানোর সময় আবু লুলু ফিরোজ নামক এক অগ্নিপূজক (পারসিক দাস) তাঁকে বিষাক্ত খঞ্জর দিয়ে আঘাত করে। শাহাদাতের আগে তিনি পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য ৬ সদস্যের একটি শূরা বোর্ড গঠন করে যান। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে নবীজি (সা.) ও আবু বকরের পাশে দাফন করা হয়।
প্রধান ব্যক্তিবর্গ
সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)
Sa'd ibn Abi Waqqas
কাদিসিয়া যুদ্ধের সেনাপতি, পারস্য বিজয়ের নায়ক
আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)
Abu Ubaidah ibn al-Jarrah
সিরিয়া ফ্রন্টের প্রধান সেনাপতি, 'উম্মতের আমানতদার'
খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)
Khalid ibn al-Walid
পারস্য ও সিরিয়া বিজয়ের প্রধান আর্কিটেক্ট, যাকে উমর (রা.) সেনাপতি থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন যাতে মানুষ তাকে ভক্তি না করে
📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ ও ইরাক-সিরিয়া ফ্রন্টে অভিযান জোরদার
ইয়ারমুক যুদ্ধে রোমানদের পরাজয় ও কাদিসিয়া যুদ্ধে পারসিকদের পরাজয়
জেরুজালেম বিজয় ও বায়তুল মুকাদ্দাস সফর
আবু লুলু ফিরোজের আক্রমণে শাহাদাত বরণ
💡 শিক্ষা ও উপদেশ
- শাসকের জবাবদিহিতা — 'ফোরাত নদীর তীরের কুকুর' এর উদাহরণ।
- আইনের শাসন — খলিফার ছেলে বা গভর্নরের ছেলে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
- জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র — বাইতুল মাল থেকে অমুসলিম ও শিশুদের ভাতার ব্যবস্থা।
- বিলাসিতা বর্জন — বিশ্বনেতা হয়েও সাধারণ জীবনযাপন।
📜 কুরআনের রেফারেন্স
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ
হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে অটল থাকো এবং আল্লাহর ওয়াস্তে সাক্ষী হও।
— সূরা নিসা ৪:১৩৫