ইতিহাসে ফিরে যান
🕌 মদীনা যুগ622-632 CE

বিদায় হজ্জ ও শেষ খুতবা

Farewell Pilgrimage

632 CE

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

১ লক্ষেরও বেশি মুসলিমসহ শেষ হজ্জ পালন। আরাফাতের ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ: মানবাধিকার, নারী অধিকার, বর্ণবাদ নিষিদ্ধ। 'আজ তোমাদের দ্বীন পূর্ণ করলাম।'

গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইসলামের পূর্ণতা ঘোষণা। মানবাধিকারের প্রথম ঘোষণাপত্র।

📖 বিস্তারিত ইতিহাস

১০ম হিজরি (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ)। নবীজি (সা.) জীবনের শেষবারের মতো হজ্জ পালনের ইচ্ছা পোষণ করলেন। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর আরব উপদ্বীপের প্রতিটি প্রান্তর থেকে লক্ষাধিক মানুষ (প্রায় ১ লক্ষ ২৪ হাজার সাহাবী) তাঁর সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য মদীনায় এবং মক্কায় সমবেত হলো। এটিই ইতিহাসে 'বিদায় হজ্জ' (হুজ্জাতুল বিদা) নামে পরিচিত। এই হজ্জে নবীজি ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা এবং মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা প্রদান করেন।

৯ই জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে জাবালুর রহমতের পাদদেশে উটের পিঠে বসে নবীজি (সা.) যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তা মানবজাতির ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন: 'হে মানুষ! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমি জানি না, আগামী বছর আমি তোমাদের সাথে এই স্থানে মিলিত হতে পারবো কিনা।' এরপর তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরেন।

ভাষণের মূল পয়েন্টগুলো ছিল: ১) রক্তের পবিত্রতা: 'তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, এবং তোমাদের সম্মান আজকের এই দিন ও এই মাসের মতোই পবিত্র।' ২) জাহিলিয়ার অবসান: 'জাহিলিয়াতের সমস্ত কুসংস্কার ও রক্তের বদলা আজ আমার পায়ের নিচে পিষ্ট হলো।' ৩) সুদের বিলুপ্তি: 'সকল প্রকার সুদ হারাম ঘোষণা করা হলো। আমি প্রথমে আমার চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের পাওনা সুদ বাতিল করলাম।' ৪) নারীর অধিকার: 'নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ। তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের অধিকার আছে। তাদের সাথে সদয় আচরণ করো।

৫) সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব: 'হে মানুষ! তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক। অনারবের ওপর আরবের, আরবের ওপর অনারবের, সাদার ওপর কালোর, বা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই — শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার (আল্লাহভীতির) ভিত্তিতে।' ৬) মুসলিম ভ্রাতৃত্ব: 'প্রতিটি মুসলিম একে অপরের ভাই। কারো সম্পত্তি তার বিনা অনুমতিতে ভোগ করা হালাল নয়।' ৭) কুরআন ও সুন্নাহ: 'আমি তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি — আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ। যতদিন তোমরা এই দুটিকে আঁকড়ে ধরবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না।'

ভাষণের শেষে নবীজি আকাশের দিকে আঙুল তুলে বললেন: 'হে আল্লাহ! আমি কি তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি?' লক্ষ জনতা সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো: 'হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন!' তখন নবীজি বললেন: 'হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো।'

সেই দিনই আরাফাতের ময়দানে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ওহী নাযিল হয়: 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।' (সূরা মায়েদা ৫:৩)। এই আয়াত শুনে হযরত আবু বকর এবং উমর (রা.) কেঁদে ফেললেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন, দ্বীন পূর্ণ হওয়ার অর্থ হলো নবীজির মিশন শেষ হয়েছে এবং তাঁর বিদায়ের সময় আসন্ন।

বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার মাত্র তিন মাস পর, ১২ই রবিউল আউয়াল ১১ হিজরিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেন। বিদায় হজ্জ ছিল তাঁর নবুওয়াতী জীবনের সমাপ্তি এবং উম্মাহর কাছে ইসলামের আমানত হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক বিদায়।

প্রধান ব্যক্তিবর্গ

রাসূলুল্লাহ (সা.)

Prophet Muhammad (SAW)

মানবজাতির উদ্দেশ্যে তাঁর সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ভাষণ প্রদান করেন

বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.)

Bilal ibn Rabah

নবীজির কথার পুনরাবৃত্তি করে দূরবর্তী মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন (মানব মাইক)

আবু বকর (রা.)

Abu Bakr (RA)

দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আয়াত শুনে নবীজির বিদায়ের ইঙ্গিত বুঝতে পারেন

📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ

৯ জিলহজ্জ ১০ হি.

আরাফাতের ময়দানে ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণ

১০ হিজরি

ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা ঘোষণা ও মানবাধিকারের সনদ প্রদান

💡 শিক্ষা ও উপদেশ

  • বর্ণবাদ ও জাতিভেদ প্রথা ১৪০০ বছর আগেই ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে।
  • নারীর অধিকার এবং সম্মান রক্ষা করা মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।
  • সুদ অর্থনীতি ধ্বংস করে — তাই ইসলামে তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
  • বিদায় হজ্জের ভাষণই মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত সংবিধান।

📜 কুরআনের রেফারেন্স

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।

সূরা মায়েদা ৫:৩