ইতিহাসে ফিরে যান
🕌 মদীনা যুগ622-632 CE

নবীজি (সা.) এর ওফাত

Death of Prophet Muhammad ﷺ

632 CE

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

১২ রবিউল আউয়াল, ৬৩ বছর বয়সে মদীনায় ইন্তেকাল করেন। আয়েশা (রা.) এর কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মসজিদে নববীতে দাফন।

গুরুত্ব ও তাৎপর্য

নবুওয়াতের সমাপ্তি। কিন্তু তাঁর শিক্ষা চিরস্থায়ী।

📖 বিস্তারিত ইতিহাস

দশম হিজরিতে বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পর থেকেই নবীজি (সা.) বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর সময় ফুরিয়ে এসেছে। ১১শ হিজরির সফর মাসের শেষ দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুরুতে প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও জ্বর ছিল। অসুস্থতা বাড়তে থাকলে তিনি স্ত্রীদের অনুমতি নিয়ে মা আয়েশা (রা.)-এর ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি মসজিদে নববীতে ইমামতি করতে পারছিলেন না। তিনি আবু বকর (রা.)-কে নামাজের ইমামতি করার নির্দেশ দেন। এটি ছিল এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত যে তাঁর পরে আবু বকরই হবেন উম্মাহর নেতা।

মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তাঁর জ্বর কিছুটা কমে। তিনি দুই সাহাবীর কাঁধে ভর দিয়ে জোহরের সময় মসজিদে আসেন। আবু বকর (রা.) ইমামতি করছিলেন, নবীজিকে দেখে তিনি সরে আসতে চাইলে নবীজি তাঁকে জায়গায় থাকতে ইঙ্গিত করেন এবং তাঁর পাশে বসে নামাজ আদায় করেন। নামাজের পর তিনি সাহাবীদের উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন ভাষণ দেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া এবং আল্লাহর সান্নিধ্যের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলেছিলেন, সে বান্দা আল্লাহর সান্নিধ্য বেছে নিয়েছে।' আবু বকর (রা.) এই কথার অর্থ বুঝে কেঁদে ফেলেন।

১২ই রবিউল আউয়াল, ১১শ হিজরি (৬৩২ খ্রি.), সোমবার সকাল। নবীজি আয়েশা (রা.)-এর কোলে মাথা রেখে শায়িত ছিলেন। তাঁর শরীর অত্যন্ত দুর্বল ছিল। তিনি বারবার মেসওয়াক করছিলেন। তাঁর শেষ কথাগুলো ছিল: 'আল্লাহুম্মা আর-রাফিক আল-আ'লা' (হে আল্লাহ! পরম বন্ধু, শ্রেষ্ঠ বন্ধু)। এরপর তাঁর পবিত্র রুহ মোবারক মহান প্রভুর সান্নিধ্য চলে যায়।

নবীজির ওফাতের খবর শুনে মদীনায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সাহাবীরা শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন। উমর (রা.) তরবারি খোলা রেখে ঘোষণা করেন, 'যে বলবে নবীজি মারা গেছেন, আমি তার মাথা কেটে ফেলব।' উসমান (রা.) বোবা হয়ে যান, আলী (রা.) বসে পড়েন।

এই চরম বিশৃঙ্খল মুহূর্তে আবু বকর (রা.) অসামান্য দৃঢ়তার পরিচয় দেন। তিনি নবীজির কপালে চুম্বন করে মসজিদে এসে বলেন, 'ওহে জনগণ! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদের পূজা করত, তারা জেনে রাখুক মুহাম্মাদ মারা গেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করত, তারা জেনে রাখুক আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি কখনো মরবেন না।' এরপর তিনি সূরা আলে-ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত পাঠ করেন।

আয়াতটি শোনার পর সাহাবীদের হুঁশ ফেরে। উমর (রা.) মাটিতে বসে পড়েন। সবাই বুঝতে পারেন যে, প্রিয় নবী আর নেই। নবীজিকে যে ঘরে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন (আয়েশার হুজরা), সেখানেই দাফন করা হয়।

নবীজির ইন্তেকাল ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা। কিন্তু তিনি রেখে গিয়েছিলেন কুরআন এবং তাঁর সুন্নাহ। তিনি একটি বিভক্ত ও বর্বর জাতিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর রেখে যাওয়া আলো আজও বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে।

প্রধান ব্যক্তিবর্গ

আয়েশা (রা.)

Aisha (RA)

নবীজির স্ত্রী, যার কোলে মাথা রেখে নবীজি ওফাত লাভ করেন

আবু বকর (রা.)

Abu Bakr (RA)

নবীজির ওফাতের পর উম্মাহকে শান্ত করেন এবং প্রথম খলিফা হন

উমর (রা.)

Umar (RA)

নবীজির মৃত্যু সংবাদে যিনি শোকে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন

📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ

৬৩২ CE, ১২ রবিউল আউয়াল

নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর ওফাত

💡 শিক্ষা ও উপদেশ

  • মৃত্যু অবধারিত — এমনকি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ হাবিবও মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেছেন।
  • ব্যক্তিপূজা নয়, আদর্শের অনুসরণ — ইসলাম কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, এটি আল্লাহর দ্বীন।
  • সংকটকালে ধীরস্থির থাকা — আবু বকর (রা.) এর মতো আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

📜 কুরআনের রেফারেন্স

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ ۚ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ

মুহাম্মাদ একজন রাসূল মাত্র; তাঁর আগে বহু রাসূল গত হয়েছেন। সুতরাং যদি তিনি মারা যান অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পিঠ ফিরিয়ে ফিরে যাবে?

সূরা আলে-ইমরান ৩:১৪৪