ইতিহাসে ফিরে যান
🕌 মদীনা যুগ622-632 CE

উহুদের যুদ্ধ

Battle of Uhud

625 CE

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

কুরাইশরা ৩০০০ সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করে। তীরন্দাজদের পদত্যাগে মুসলিমরা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েন। হামযা (রা.) শহীদ হন। নবীজি আহত হন।

গুরুত্ব ও তাৎপর্য

নেতার আদেশ মেনে চলা ও শৃঙ্খলার গুরুত্ব।

📖 বিস্তারিত ইতিহাস

বদর যুদ্ধের শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মক্কার কুরাইশরা পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তারা ৩,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করে। এতে ২০০ অশ্বারোহী এবং ৭০০ বর্মধারী যোদ্ধা ছিল। নারী যাত্রীদলে হিন্দ বিন্তে উতবা (আবু সুফিয়ানের স্ত্রী) ছিল, যে বদরে নিহত তার বাবার হত্যার বদলা নিতে শপথ নিয়েছিল। ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে (৩য় হিজরি) তারা মদীনার অদূরে ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে শিবির স্থাপন করে।

নবীজি (সা.) খবর পেয়ে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। তিনি চেয়েছিলেন মদীনার ভেতরে থেকে প্রতিরক্ষা যুদ্ধ করতে। কিন্তু তরুণ সাহাবীরা, যারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তারা খোলা ময়দানে যুদ্ধ করার জন্য আবেগী হয়ে পড়েন। সাহাবীদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নবীজি বর্ম পরিধান করেন এবং ১,০০০ সাহাবী নিয়ে ওহুদের দিকে রওনা হন। পথিমধ্যে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ৩০০ লোক নিয়ে দল ত্যাগ করে, ফলে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা কমে ৭০০-তে দাঁড়ায়।

যুদ্ধের ময়দানে নবীজি (সা.) অত্যন্ত নিপুণ রণকৌশল সাজান। তিনি ওহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে মুসলিম বাহিনীকে দাঁড় করান। বাম পাশের 'জাবালে রুমাত' (তীরন্দাজদের পাহাড়) নামক টিলায় আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর নেতৃত্বে ৫০ জন তীরন্দাজকে মোতায়েন করেন। নবীজি তাদের কঠোর নির্দেশ দেন: 'আমাদের জয় হোক বা পরাজয়, আমরা মারা যাই বা পাখি আমাদের ঠুকরে খায়—তোমরা কোনো অবস্থাতেই আমার পরবর্তী নির্দেশ ছাড়া এই টিলা ত্যাগ করবে না।'

যুদ্ধের শুরুতে মুসলিমদের বীরত্বের সামনে কুরাইশ বাহিনী টিকতে পারল না। তারা পালাতে শুরু করল। মুসলিমরা গনীমতের মাল সংগ্রহ করতে শুরু করল। টিলায় থাকা তীরন্দাজরা ভাবল যুদ্ধ শেষ, এখন গনীমত সংগ্রহ করা দরকার। নেতার নিষেধ সত্ত্বেও ৪০ জন তীরন্দাজ টিলা ত্যাগ করে নিচে নেমে এল। মাত্র ১০ জন সেখানে রয়ে গেল।

কুরাইশ অশ্বারোহী বাহিনীর নেতা খালিদ বিন ওয়ালিদ (তখনও মুসলিম হননি) এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সে পেছনের অরক্ষিত দিক থেকে মুসলিমদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। মুহূর্তে জয়ের আনন্দ বিষাদে রূপ নিল। বিশৃঙ্খলার মধ্যে মুসলিমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল।

এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে শত্রুরা নবীজির ওপর হামলা চালায়। উৎবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস পাথর ছুড়ে নবীজির নিচের পাটির একটি দাঁত (রুবাই) শহীদ করে। তাঁর মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয় এবং লোহার শিরস্ত্রাণ গণ্ডদেশে ঢুকে যায়। এক পর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, 'মুহাম্মাদ নিহত হয়েছেন'। এতে মুসলিমদের মনোবল একেবারে ভেঙে পড়ে।

কিন্তু কিছু সাহাবী নবীজিকে ঘিরে মানবেতর দেওয়াল তৈরি করেন। তালহা (রা.) নিজের হাত দিয়ে তীরের আঘাত ঠেকান, ফলে তাঁর হাত অবশ হয়ে যায়। আবু দুজানা (রা.) নবীজির ঢাল হয়ে পিঠে অসংখ্য তীরের আঘাত সহ্য করেন।

এই যুদ্ধে নবীজির চাচা ও 'আল্লাহর সিংহ' হামজা (রা.) বীরত্বের সাথে লড়ছিলেন। কিন্তু ওয়াহশি নামক এক হাবশি গোলাম তাঁকে বর্শা দিয়ে শহীদ করে। হিন্দ বিন্তে উতবা তার কলিজা চিবিয়ে ভক্ষণ করে নিজের আক্রোশ মেটায়।

অবশেষে নবীজি ও সাহাবীরা ওহুদ পাহাড়ের একটি সুরক্ষিত স্থানে আশ্রয় নেন। কুরাইশরা চলে যায়। এই যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হন। নবীজি হামজা (রা.)-এর বিকৃত লাশ দেখে কেঁদে ওঠেন।

ওহুদ যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। নবীজির আদেশ অমান্য করার এবং দুনিয়ার সম্পদের (গনীমত) লোভ করার করুণ পরিণতি তারা হাতেনাতে পায়। আল্লাহ সূরা আলে-ইমরানে এই যুদ্ধের পর্যালোচনা করে বলেন যে, এটি ছিল মুমিনদের ঈমান পরীক্ষা করার এবং মুনাফিকদের আলাদা করার একটি মাধ্যম।

প্রধান ব্যক্তিবর্গ

হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.)

Hamza ibn Abdul Muttalib

শহীদদের সর্দার (সাইয়্যেদুশ শুহাদা), নবীজির আপন চাচা

মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)

Mus'ab ibn Umayr

পতাকাবাহী, যিনি শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত পতাকা ছাড়েননি

খালিদ বিন ওয়ালিদ

Khalid ibn Walid

কুরাইশ সেনাপতি, যার কৌশলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়

হিন্দ বিনতে উতবা

Hind bint Utbah

কুরাইশ নারী নেত্রী, যে হামজার লাশ বিকৃত করেছিল

📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ

৬২৫ CE (শাউয়াল, ৩য় হিজরি)

ওহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়

💡 শিক্ষা ও উপদেশ

  • নেতার আনুগত্য অপরিহার্য — একটু অবাধ্যতা জয়ের মুহূর্তে পরাজয় ডেকে আনতে পারে।
  • দুনিিয়ার মোহ (গনীমত) ত্যাগের শিক্ষা।
  • বিপদ ও গুজবে ধীরস্থির থাকা — নবীজির মৃত্যুর গুজবে অনেকে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন, যা উচিত ছিল না।
  • আল্লাহর সাহায্য শর্তসাপেক্ষ — বদরে সাহায্য এসেছিল আনুগত্যের কারণে, ওহুব তা আসেনি অবাধ্যতার কারণে।

📜 কুরআনের রেফারেন্স

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ

মুহাম্মাদ একজন রাসূল মাত্র; তাঁর আগে বহু রাসূল গত হয়েছেন।

সূরা আলে-ইমরান ৩:১৪৪

وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُم بِإِذْنِهِ

আল্লাহ তো তোমাদের সাথে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন যখন তোমরা তাঁর অনুমতিক্রমে তাদের বিনাশ করছিলে...

সূরা আলে-ইমরান ৩:১৫২