ইতিহাসে ফিরে যান
🕌 মদীনা যুগ622-632 CE

খন্দকের যুদ্ধ (পরিখার যুদ্ধ)

Battle of the Trench

627 CE

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

১০,০০০ সৈন্যের জোটবদ্ধ আক্রমণ। সালমান ফারসী (রা.) এর পরামর্শে মদীনার চারপাশে পরিখা খনন। প্রচণ্ড ঝড়ে শত্রুবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়।

গুরুত্ব ও তাৎপর্য

কৌশলগত চিন্তা ও আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্য।

📖 বিস্তারিত ইতিহাস

ওহুদ যুদ্ধের দুই বছর পর, ৫ম হিজরিতে (৬২৭ খ্রি.) মদীনার ইহুদি গোত্র বনু নাজির (যাদের মদীনা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল) মক্কার কুরাইশ এবং অন্যান্য বেদুইন গোত্রগুলোকে (গাতফান, আসাদ, সুলাইম) মুসলিমদের বিরুদ্ধে একজোট করে। তারা ১০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল কনফেডারেশন বা 'আহযাব' (সম্মিলিত বাহিনী) গঠন করে মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

এই বিশাল বাহিনীর খবর শুনে মুসলিমরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। মদীনার সব পুরুষ মিলিয়ে মাত্র ৩,০০০ যুদ্ধোপযুক্ত লোক ছিল। খোলা ময়দানে যুদ্ধ করলে পরাজয় নিশ্চিত। এই সংকটের মুহূর্তে পারস্যের সাহাবী সালমান ফারসী (রা.) এক অভিনব কৌশলের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! পারস্যে আমরা শত্রু দ্বারা অবরুদ্ধ হলে শহরের চারপাশে পরিখা (Trench) খনন করতাম।' আরবদের কাছে এই কৌশল ছিল সম্পূর্ণ নতুন। নবীজি (সা.) এই প্রস্তাব পছন্দ করলেন।

মদীনার তিন দিক পাহাড় ও কৃষিখেত দ্বারা সুরক্ষিত ছিল, শুধু উত্তর দিকটি ছিল উন্মুক্ত। নবীজি সাহাবীদের নিয়ে সেই উত্তর দিকে পরিখা খনন শুরু করলেন। মাটি কাটার কঠিন পরিশ্রমে নবীজি নিজেও অংশগ্রহণ করেন। ক্ষুধায় সাহাবীরা পেটে পাথর বেঁধে কাজ করতেন। নবীজির পেটেও পাথর বাঁধা ছিল। খননকালে বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটে, যেমন জাবির (রা.)-এর সামান্য খাবারে হাজার মানুষের পেট ভরে যাওয়া এবং শক্ত পাথর নবীজির আঘাতে বালি হয়ে যাওয়া।

মাত্র ছয় দিনে পরিখা খনন শেষ হয়। শত্রু বাহিনী এসে গভীর পরিখা দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। তাদের ঘোড়া বা উট লাফিয়ে পার হতে পারত না। তারা বাধ্য হয়ে পরিখার ওপারে তাবু ফেলে অবরোধ শুরু করে।

অবরোধ চলাকালে এক নতুন বিপদ দেখা দেয়। মদীনার ভেতরে থাকা ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজা তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে এবং পেছন থেকে মুসলিমদের আক্রমণ করার ষড়যন্ত্র করে। এটি ছিল মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে ভয়ের সময়। আল্লাহ কুরআনে এই অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন: 'যখন তোমাদের চক্ষু স্থির হয়ে গিয়েছিল এবং প্রাণ কণ্ঠাগত হয়েছিল...' (৩৩:১০)।

প্রায় এক মাস অবরোধ চলল। শীতের প্রকোপ বাড়তে শুরু করল। খাদ্য সংকট দেখা দিল। কিন্তু সাহাবীদের ঈমান অটুট ছিল। এই সময় নুয়াইম ইবনে মাসউদ নামে গাতফান গোত্রের একজন নেতা গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি চমৎকার কৌশলে কুরাইশ এবং ইহুদিদের মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহের বীজ বুনে দেন, যার ফলে তাদের জোটে ফাটল ধরে।

অবশেষে আল্লাহ তাআলা এক প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাস (হারিকেন) পাঠালেন। এই বাতাস শত্রুদের তাঁবু উপড়ে ফেলল, তাদের রান্নার পাতিল উল্টে দিল এবং আগুনের কুণ্ডলী নিভিয়ে দিল। প্রচণ্ড শীত ও ধূলিঝড়ে তারা টিকতে না পেরে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেল।

কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছাড়াই আল্লাহ মুমিনদের বিজয় দান করলেন। এই যুদ্ধের পর নবীজি (সা.) বলেছিলেন, 'আজকের পর থেকে কুরাইশরা আর আমাদের আক্রমণ করতে আসবে না, বরং আমরাই তাদের আক্রমণ করব।' এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল।

প্রধান ব্যক্তিবর্গ

সালমান ফারসী (রা.)

Salman al-Farsi

পরিখা খননের কৌশল বাৎলে দেওয়া পারস্যের সাহাবী

নুয়াইম ইবনে মাসউদ (রা.)

Nuaym ibn Masud

যিনি কৌশলে শত্রু জোটে ভাঙন ধরান

সাফিয়া বিনতে আব্দুল মুত্তালিব (রা.)

Safiyyah bint Abdul Muttalib

নবীজির ফুফু, যিনি দুর্গের ভেতর এক ইহুদি গুপ্তচরকে হত্যা করেন

📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ

৬২৭ CE (৫ম হিজরি)

খন্দকের যুদ্ধ বা আহযাবের যুদ্ধ

💡 শিক্ষা ও উপদেশ

  • পরামর্শ (শূরা) নেওয়ার গুরুত্ব — নবীজি অন্যের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন।
  • উদ্ভাবনী কৌশল — গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে চিন্তা করা (পরিখা খনন)।
  • বিপদে আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্য — ঝড়-বাতাস দিয়ে সাহায্য।
  • নেতৃত্বের উদাহরণ — নেতা কর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবেন।

📜 কুরআনের রেফারেন্স

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا

হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে এসেছিল, তখন আমি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম প্রচণ্ড বায়ু...

সূরা আহযাব ৩৩:৯