ইতিহাসে ফিরে যান
নবুওয়াত ও মক্কা যুগ610-622 CE

আমুল হুযন — দুঃখের বছর

Year of Sorrow

619 CE

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

একই বছরে চাচা আবু তালিব এবং স্ত্রী খাদিজা (রা.) মারা যান। নবীজি (সা.) সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হন।

গুরুত্ব ও তাৎপর্য

সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর উপর ভরসা।

📖 বিস্তারিত ইতিহাস

শি'বে আবি তালিবের অমানবিক বয়কট থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই নবীজি (সা.) এর জীবনে নেমে আসে এক গভীর শোকের ছায়া। নবুওয়াতের ১০ম বছরটি ইসলামের ইতিহাসে 'আমুল হুযন' বা শোকের বছর হিসেবে পরিচিত। এই বছরে নবীজি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুই অবলম্বন হারান।

প্রথমে ইন্তেকাল করেন তাঁর প্রিয় চাচা ও অভিভাবক আবু তালিব (৮৭ বছর বয়সে)। আবু তালিব আজীবন ইসলাম গ্রহণ করেননি, কিন্তু তিনি ছিলেন নবীজির সবচেয়ে বড় জাগতিক ঢাল। কুরাইশরা শত চেষ্টা করেও আবু তালিবের ভয়ে নবীজির কোনো বড় ক্ষতি করতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুতে নবীজি অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং মক্কায় তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

চাচার মৃত্যুর মাত্র তিন দিন (বা দেড় মাস) পর ইন্তেকাল করেন নবীজির প্রিয়তমা স্ত্রী ও পরকালের সাথী উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা.) (৬৫ বছর বয়সে)। খাদিজা ছিলেন নবীজির প্রথম বিশ্বাসী, প্রধান পরামর্শদাতা এবং মানসিক প্রশান্তির উৎস। নবুওয়াতের কঠিন দিনগুলোতে যখন সবাই নবীজিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন খাদিজা নিজের সব সম্পদ দিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে নবীজি এতটাই একাকী বোধ করলেন যে, তিনি প্রায়ই ঘরে বসে কাঁদতেন।

এই দুই রক্ষকের বিদায়ের পর কুরাইশরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আবু তালিব বেঁচে থাকতে তারা যা করার সাহস পেত না, এখন তা শুরু করল। একদিন নবীজি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এক দুর্বৃত্ত তাঁর মাথায় ধুলো ও ময়লা নিক্ষেপ করল। নবীজি সেই অবস্থাতেই বাড়ি ফিরলেন। তাঁর এক মেয়ে কেঁদে কেঁদে সেই ময়লা পরিষ্কার করছিলেন, তখন নবীজি বললেন, 'মা কেঁদো না, আল্লাহ তোমার বাবাকে রক্ষা করবেন। আবু তালিব মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কুরাইশরা আমার সাথে এত খারাপ আচরণ করতে পারেনি।'

মক্কায় দাওয়াতের পথ রুদ্ধ দেখে নবীজি নতুন আশ্রয়ের আশায় তায়েফ গমনের সিদ্ধান্ত নেন। সাথে ছিলেন জায়েদ বিন হারিসা। কিন্তু তায়েফের সর্দাররা (বনু সাকিফ) নবীজির দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে এবং শহরের বখাটে ছেলেদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দেয়। তারা পাথর মেরে নবীজির শরীর রক্তাক্ত করে দেয়। রক্ত গড়িয়ে তাঁর জুতোর সাথে আটকে গিয়েছিল। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।

জ্ঞান ফেরার পর নবীজি দেখলেন জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে পাহাড়ের ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আছেন। ফেরেশতা বললেন, 'হে ওহুদ, আপনি হুকুম দিলে আমি দুই পাশের পাহাড় দিয়ে তায়েফবাসীকে পিষে মারব।' কিন্তু 'রাহমাতুল্লিল আলামিন' (বিশ্বজগতের জন্য করুণা) নবীজি উত্তর দিলেন, 'না! আমি আশা করি আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্যে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।' এই মহান ধৈর্যের ফলেই পরবর্তীতে পুরো তায়েফবাসী ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

এই চরম হতাশা ও বেদনার মুহূর্তেই আল্লাহ নবীজিকে 'ইসরা ও মি'রাজ'-এর মাধ্যমে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নেন এবং ৫ ওয়াক্ত নামাজ উপহার দেন, যা ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

প্রধান ব্যক্তিবর্গ

আবু তালিব

Abu Talib

নবীজির চাচা ও রাজনৈতিক রক্ষক

খাদিজা (রা.)

Khadijah (RA)

নবীজির স্ত্রী ও মানসিক প্রশান্তির উৎস

সাউদা বিনতে জুমআ (রা.)

Sawda bint Zam'a

খাদিজা (রা.) এর মৃত্যুর পর নবীজির দ্বিতীয় স্ত্রী

আদ্দাস

Addas

তায়েফের এক খ্রিস্টান দাস, যিনি নবীজিকে আঙুর খেতে দেন ও সম্মান জানান

📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ

৬১৯ CE

আবু তালিব ও খাদিজা (রা.) এর ইন্তেকাল

৬১৯ CE (জুন)

তায়েফ সফর ও নির্যাতন

💡 শিক্ষা ও উপদেশ

  • দুনিয়ার সব অবলম্বন হারিয়ে গেলেও আল্লাহই একমাত্র ভরসা — নবীজিকে আল্লাহ শেখালেন যে চাচা বা স্ত্রী নয়, তিনিই প্রকৃত রক্ষক।
  • প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ক্ষমা ও দয়া — তায়েফের ঘটনা ক্ষমার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত।
  • বিপদের পরেই আসে মুক্তি — তায়েফের চরম অপমানের পরেই মি'রাজের সর্বোচ্চ সম্মান।
  • কষ্টের সময় ইবাদত (নামাজ) সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

📜 কুরআনের রেফারেন্স

فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا ○ إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا

নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।

সূরা ইনশিরাহ ৯৪:৫-৬

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।

সূরা আম্বিয়া ২১:১০৭