ইতিহাসে ফিরে যান
নবুওয়াত ও মক্কা যুগ610-622 CE

ইসরা ও মি'রাজ

Night Journey & Ascension

620 CE

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় এবং সেখান থেকে সাত আসমান পেরিয়ে আল্লাহর নিকটে গমন। এই রাতে ৫ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়।

গুরুত্ব ও তাৎপর্য

নামাজ — ঈমানের স্তম্ভ — এই রাতেই উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।

📖 বিস্তারিত ইতিহাস

৬২১ খ্রিস্টাব্দে (হিজরতের এক বছর আগে) সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম অলৌকিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা — আল-ইসরা ওয়াল মি'রাজ। এই সময়টি ছিল নবীজির জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়, যাকে 'আমুল হুযন' বা দুঃখের বছর বলা হয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং পরম হিতৈষী চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি প্রস্তরাঘাতে রক্তাক্ত হন। যখন পৃথিবীর সব দরজা যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আল্লাহ তাঁকে মহাকাশ ভ্রমণের মাধ্যমে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নেন।

ঘটনাটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশ 'ইসরা' (রাত্রিকালীন ভ্রমণ) — মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ। রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে (তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে) জিবরাঈল (আ.) নবীজির কাছে আসেন এবং তাঁকে 'বুরাক' নামক একটি বিশেষ বাহনে আরোহণ করতে বলেন। চোখের পলকে নবীজি জেরুজালেমে পৌঁছান। সেখানে তিনি সকল নবী-রাসূলদের (আদম থেকে ঈসা পর্যন্ত) ইমামতি করে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। এটি ছিল বিশ্বনবী হিসেবে তাঁর নেতৃত্বের এক মহা স্বীকৃতি।

দ্বিতীয় অংশ 'মি'রাজ' (ঊর্ধ্বগমন) — জেরুজালেম থেকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত মহাকাশ ভ্রমণ। জিবরাঈল (আ.) নবীজিকে নিয়ে সাত আসমান পাড়ি দেন। প্রথম আসমানে আদম (আ.), দ্বিতীয় আসমানে ঈসা ও ইয়াহিয়া (আ.), তৃতীয় আসমানে ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আসমানে ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে মূসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে ইবরাহীম (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ ও সালাম বিনিময় করেন। বায়তুল মামুরে (ফেরেশতাদের কাবা) তিনি অগণিত ফেরেশতাকে ইবাদতে মগ্ন দেখেন।

সপ্তম আসমানের পর জিবরাঈল (আ.) থেমে যান এবং বলেন: 'এর পরে আমি আর এক কদম এগোলে আল্লাহর নূরের তাজাল্লিতে আমার ডানা পুড়ে যাবে। এখান থেকে আপনাকে একাই যেতে হবে।' নবীজি 'রফরফ' নামক বাহনে চড়ে এমন এক স্থানে পৌঁছান যেখানে আল্লাহর আরশ অবস্থিত এবং কলমের খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সেখানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে তাঁর সরাসরি কথোপকথন হয় — মাঝখানে কোনো মাধ্যম ছিল না।

মি'রাজেই আল্লাহ এই উম্মতকে উপহার হিসেবে ৫০ ওয়াক্ত সালাত দান করেন। ফেরার পথে মূসা (আ.) এর পরামর্শে নবীজি কয়েকবার আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে সালাত কমানোর অনুরোধ করেন। অবশেষে আল্লাহ ৫ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেন, কিন্তু ঘোষণা দেন: 'যে ব্যক্তি এই ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে, তাকে ৫০ ওয়াক্তের সওয়াব দেওয়া হবে।' এছাড়াও সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত এবং শিরক না করা মুমিনদের ক্ষমার সুসংবাদও এখান থেকেই দেওয়া হয়।

নবীজি জান্নাত ও জাহান্নাম স্বচক্ষে দেখেন। জান্নাতে তিনি মুমিনদের নিয়ামত এবং জাহান্নামে পাপাচারীদের ভয়াবহ শাস্তি প্রত্যক্ষ করেন — যেমন সুদখোর, গীবতকারী, এতিমের মাল ভক্ষণকারীদের শাস্তি। এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তীতে উম্মতকে সতর্ক করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

পরদিন সকালে নবীজি যখন কুরাইশদের কাছে এই ঘটনার বর্ণনা দেন, তারা উপহাস শুরু করে। তারা বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এক রাতে কেউ জেরুজালেম গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে। তারা আবু বকর (রা.) এর কাছে গিয়ে বললো: 'তোমার বন্ধু কী বলছে শুনেছো?' আবু বকর (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললেন: 'তিনি যদি এ কথা বলে থাকেন, তবে তা অবশ্যই সত্য।' এই অবিচল বিশ্বাসের কারণেই তাঁকে 'আস-সিদ্দিক' (মহাসত্যবাদী) উপাধি দেওয়া হয়। কুরাইশরা যখন নবীজিকে বাইতুল মুকাদ্দাসের বর্ণনা জিজ্ঞেস করলো (যা তিনি আগে কখনো দেখেননি), আল্লাহ তাঁর চোখের সামনে দৃশ্যটি তুলে ধরলেন এবং তিনি বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন, যা শুনে সবাই হতবাক হয়ে গেল।

ইসরা ও মি'রাজ কেবল একটি অলৌকিক ভ্রমণ ছিল না, এটি ছিল নবীজির নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ, সালাতের বিধান প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ সম্মান। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বিজ্ঞান ও যুক্তির উর্ধ্বে আল্লাহর কুদরত। আধুনিক বিজ্ঞান আজ মহাকাশ ভ্রমণের কথা ভাবছে, কিন্তু ১৪০০ বছর আগে আমাদের নবী (সা.) সশরীরে মহাকাশ ও সময়ের সীমানা অতিক্রম করে এসেছিলেন।

প্রধান ব্যক্তিবর্গ

জিবরাঈল (আ.)

Angel Jibreel

মি'রাজের সফরসঙ্গী, সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পথপ্রদর্শক

আবু বকর (রা.)

Abu Bakr as-Siddiq

মি'রাজের ঘটনা নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করে 'সিদ্দিক' উপাধি পান

মূসা (আ.)

Prophet Musa

ষষ্ঠ আসমানে সাক্ষাৎ করেন এবং সালাত কমানোর পরামর্শ দেন

📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ

৬২১ CE (২৭ রজব)

রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে ইসরা ও মি'রাজ সংঘটিত হয়

৬২১ CE

৫ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হয়

💡 শিক্ষা ও উপদেশ

  • সালাত মুমিনের মি'রাজ — আল্লাহ সরাসরি এই ইবাদত উপহার দিয়েছেন।
  • বিপদ ও কষ্টের পরেই আসে আল্লাহর বিশেষ করুণা ও সম্মান (ইন্নামা'আল উসরি ইউসরা)।
  • বিজ্ঞান যেখানে শেষ, আল্লাহর কুদরত সেখান থেকে শুরু।
  • আবু বকরের (রা.) মতো অটুট বিশ্বাসই ঈমানের আসল পরীক্ষা।

📜 কুরআনের রেফারেন্স

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى

পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছেন।

সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:১

لَقَدْ رَأَىٰ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَىٰ

তিনি তাঁর রবের মহান নিদর্শনাবলী দেখেছেন।

সূরা নাম ৫৩:১৮