প্রথম ওহী নাযিল — সূরা আলাক
First Revelation
সংক্ষিপ্ত বিবরণ
রমযান মাসে হেরা গুহায় জিবরাঈল (আ.) প্রথম ওহী নিয়ে আসেন: 'ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক' — পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
কুরআন নাযিলের সূচনা — মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত হেদায়েত।
📖 বিস্তারিত ইতিহাস
৬১০ খ্রিস্টাব্দ, রমযান মাসের শেষ দশকের এক রাত (সম্ভবত ২১ রমযান)। ৪০ বছর বয়সী মুহাম্মাদ (সা.) মক্কা থেকে প্রায় ৩ মাইল দূরে জাবালুন নূর (আলোর পাহাড়) পর্বতের চূড়ায় হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন। এই গুহা ছিল ছোট — মাত্র ৪ হাত লম্বা ও দেড় হাত চওড়া। কিন্তু এই ক্ষুদ্র গুহা থেকেই মানবজাতির ইতিহাস চিরতরে পাল্টে যায়। পাহাড়ের উপর থেকে কাবা ঘর দেখা যেতো — নবীজি কাবার দিকে তাকিয়ে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন।
নবুওয়াতের আগের কয়েক বছর নবীজির মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তিনি একাকীত্ব পছন্দ করতে শুরু করেন। মক্কার পৌত্তলিক সমাজ, মদ্যপান, জুয়া, নারী নির্যাতন ও অন্যায় — এসব দেখে তাঁর মন বিষণ্ণ হয়ে যেতো। তিনি মনে মনে ভাবতেন — এই মূর্তিগুলো কি সত্যিই কোনো ক্ষমতা রাখে? সৃষ্টির পেছনে কী রহস্য? মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে তিনি হেরা গুহায় দিনের পর দিন, এমনকি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধ্যান করতেন। খাদিজা (রা.) তাঁর জন্য খাবার ও পানি পাঠাতেন।
এছাড়াও নবুওয়াতের আগে তিনি 'সত্য স্বপ্ন' (রুয়ায়ে সালিহা) দেখতে শুরু করেন। তিনি রাতে যা স্বপ্ন দেখতেন, সকালে ঠিক তাই ঘটতো — যেন ভোরের আলোর মতো স্পষ্ট। এই চলে ছয় মাস। ইসলামী স্কলারদের মতে, এটি ছিল নবুওয়াতের প্রস্তুতি — আল্লাহ ধীরে ধীরে তাঁকে ওহীর জন্য প্রস্তুত করছিলেন।
সেই ঐতিহাসিক রাতে হেরা গুহায় হঠাৎ জিবরাঈল (আ.) তাঁর সামনে আবির্ভূত হন এবং বলেন: 'ইকরা!' (পড়ো!)। নবীজি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন: 'মা আনা বিকারি' — আমি পড়তে জানি না (তিনি ছিলেন উম্মী — নিরক্ষর)। জিবরাঈল তাঁকে এত জোরে আলিঙ্গন করলেন যে নবীজির শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ছেড়ে দিয়ে আবার বলেন: 'ইকরা!' নবীজি আবার বললেন: 'আমি পড়তে জানি না।' এভাবে তিনবার হলো। তৃতীয়বার ছেড়ে দিয়ে জিবরাঈল তিলাওয়াত করেন:
'ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক। খালাকাল ইনসানা মিন আলাক। ইকরা ওয়া রাব্বুকাল আকরাম। আল্লাযী আল্লামা বিল কালাম। আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়া'লাম।' — অর্থাৎ 'পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে জমাটবদ্ধ রক্তপিণ্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। পড়ো, আর তোমার প্রভু মহামহিমান্বিত। যিনি কলম দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানতো না।' (সূরা আলাক ৯৬:১-৫)। এটিই ছিল কুরআনের প্রথম নাযিলকৃত অংশ এবং মানবজাতির কাছে আল্লাহর সর্বশেষ বার্তার সূচনা।
লক্ষণীয় যে কুরআনের প্রথম শব্দ 'ইকরা' (পড়ো) — এটি জ্ঞান অন্বেষণের নির্দেশ। ইসলামের সূচনাই হলো জ্ঞানের আহ্বান দিয়ে। নিরক্ষর নবীকে 'পড়তে' বলা — এটা ছিল এক বিশাল বার্তা: আল্লাহ চান মানুষ জ্ঞান অর্জন করুক। কলমের কসম খাওয়া হয়েছে, লেখনীর মাধ্যমে জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিতরণের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। এই একটি ঘটনায় ইসলামের জ্ঞানভিত্তিক দর্শনের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়ে যায়।
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নবীজি পাহাড় থেকে নেমে বাড়ি ফিরে আসেন। তাঁর মুখ বিবর্ণ, শরীর কাঁপছে। তিনি খাদিজা (রা.) কে বলেন: 'যাম্মিলূনী, যাম্মিলূনী!' — আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও! আমাকে ঢেকে দাও! আমি আমার নিজের জীবনের জন্য ভয় পাচ্ছি!' খাদিজা (রা.) — ইসলামের প্রথম নারী, প্রথম বিশ্বাসী — তিনি নবীজিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন: 'না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমানিত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, দরিদ্র ও অসহায়দের বোঝা বহন করেন, অতিথিদের আপ্যায়ন করেন, সত্যের পথে বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করেন।'
খাদিজা তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে নবীজিকে নিয়ে যান। ওয়ারাকা ছিলেন জাহিলিয়া যুগের বিরল একত্ববাদী (হানীফ), তাওরাত ও ইঞ্জিল হিব্রু ভাষায় পড়তে পারতেন। নবীজির অভিজ্ঞতা শুনে ওয়ারাকা বলেন: 'এই সেই নামুস (জিবরাঈল — গোপন বার্তাবাহক) যাকে আল্লাহ মূসার কাছে পাঠিয়েছিলেন। আহা! যদি আমি তখন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারতাম যখন তোমার সম্প্রদায় তোমাকে বের করে দেবে!' নবীজি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন: 'তারা কি আমাকে বের করে দেবে?' ওয়ারাকা বললেন: 'হ্যাঁ, তুমি যা নিয়ে এসেছো তা নিয়ে যে-ই এসেছে তার সাথে শত্রুতা করা হয়েছে। যদি সেদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকি, আমি তোমাকে পূর্ণ সহায়তা করবো।' কিন্তু ওয়ারাকা এর কিছুদিন পরই ইন্তেকাল করেন।
প্রথম ওহী নাযিলের পর কিছুদিন ওহী আসা বন্ধ থাকে — এই সময়কে 'ফাতরাতুল ওহী' (ওহীর বিরতি) বলা হয়। এটি ছিল কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত (বিভিন্ন বর্ণনায় ৬ মাস থেকে ৩ বছর — তবে অধিকাংশ আলেমের মতে সংক্ষিপ্ত সময়)। এই বিরতিকালে নবীজি অত্যন্ত চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন ছিলেন — তিনি ভাবছিলেন, আল্লাহ কি তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন? পরে সূরা দুহায় আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দেন: 'তোমার রব তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি অসন্তুষ্টও হননি।' (সূরা দুহা ৯৩:৩)।
অবশেষে ওহী পুনরায় শুরু হয় সূরা মুদ্দাসসিরের মাধ্যমে: 'ইয়া আইয়্যুহাল মুদ্দাসসির, কুম ফাআনযির' — 'হে বস্ত্রাবৃত! ওঠো এবং সতর্ক করো!' এবার নবীজি বুঝতে পারলেন — এটি কোনো সাময়িক ব্যাপার নয়, এটি একটি স্থায়ী দায়িত্ব। আল্লাহ তাঁকে সমগ্র মানবজাতিকে সতর্ক করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রথম ওহীতে ছিল জ্ঞানের আহ্বান আর দ্বিতীয় ওহীতে ছিল দাওয়াতের নির্দেশ — এভাবেই ইসলামের যাত্রা শুরু হলো।
প্রধান ব্যক্তিবর্গ
জিবরাঈল (আ.)
Angel Jibreel (Gabriel)
ওহী বহনকারী শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা, আল্লাহ ও নবীদের মধ্যে যোগাযোগকারী
খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)
Khadijah bint Khuwaylid
নবীজির প্রথম স্ত্রী, প্রথম মুসলিম নারী, সবচেয়ে কঠিন সময়ে নবীজিকে সান্ত্বনা ও সমর্থন দেন
ওয়ারাকা ইবনে নওফল
Waraqah ibn Nawfal
খাদিজার চাচাতো ভাই, হিব্রু ভাষায় তাওরাত-ইঞ্জিল পাঠকারী পণ্ডিত, নবুওয়াত সত্যায়ন করেন
📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
হেরা গুহায় প্রথম ওহী নাযিল — সূরা আলাকের প্রথম ৫ আয়াত
কিছুদিন/মাস ওহী আসা বন্ধ থাকে — নবীজি চিন্তিত হন
সূরা মুদ্দাসসির নাযিল — 'ওঠো এবং সতর্ক করো'
💡 শিক্ষা ও উপদেশ
- জ্ঞান অন্বেষণ ইসলামের প্রথম ও সবচেয়ে মৌলিক নির্দেশ — 'ইকরা' (পড়ো)।
- কঠিন মুহূর্তে পরিবারের (বিশেষত স্ত্রীর) সাহায্য, সান্ত্বনা ও বিশ্বাস অমূল্য।
- সত্যবাদিতা, সেবা ও চরিত্রের গুণাবলী — এগুলোই নবুওয়াতের প্রস্তুতি ছিল।
- একজন নিরক্ষর মানুষ জ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিপ্লব আনলেন — এটি কুরআনের অলৌকিকতার প্রমাণ।
📜 কুরআনের রেফারেন্স
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ○ خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ ○ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ ○ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ○ عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ
পড়ো তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। পড়ো, তোমার রব মহামহিমান্বিত। যিনি কলম দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানতো না।
— সূরা আলাক ৯৬:১-৫
يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ ○ قُمْ فَأَنذِرْ ○ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ
হে বস্ত্রাবৃত! ওঠো এবং সতর্ক করো। তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো।
— সূরা মুদ্দাসসির ৭৪:১-৩