খাদিজা (রা.) এর সাথে বিবাহ
Marriage to Khadijah
সংক্ষিপ্ত বিবরণ
২৫ বছর বয়সে ৪০ বছর বয়সী ধনী ব্যবসায়ী খাদিজা (রা.) কে বিবাহ করেন। খাদিজা ছিলেন তাঁর প্রথম স্ত্রী এবং ইসলামের প্রথম বিশ্বাসী।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
খাদিজা (রা.) ইসলামের প্রথম মুসলিম এবং নবীর সবচেয়ে বড় সহায়ক ছিলেন।
📖 বিস্তারিত ইতিহাস
যৌবনে পদার্পণ করার পর নবী মুহাম্মাদ (সা.) মক্কার সমাজে তাঁর সততা, আমানতদারি ও উত্তম চরিত্রের জন্য সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। মানুষ তাঁকে ভালোবেসে 'আল-আমিন' (বিশ্বস্ত) ও 'আস-সাদিক' (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করে। মক্কার অধিবাসীরা তাদের মূল্যবান সম্পদ তাঁর কাছে আমানত রাখত। তৎকালীন জাহিলিয়া যুগের পাপাচার, মদ্যপান ও জুয়া থেকে আল্লাহ তাঁকে সম্পূর্ণ পবিত্র রেখেছিলেন।
মক্কার অন্যতম ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত নারী ছিলেন খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)। তিনি 'তাহেরা' (পবিত্রা) নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন এবং পুরুষদের মাধ্যমে সিরিয়া ও ইয়েমেনে বাণিজ্যিক কাফেলা পাঠাতেন। নবীজির সততার খ্যাতি শুনে তিনি তাঁকে তাঁর ব্যবসার দায়িত্ব দিয়ে সিরিয়ায় পাঠানোর প্রস্তাব দেন এবং অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
নবীজি (সা.) খাদিজার পণ্য নিয়ে সিরিয়ার বুসরা নগরীতে যান। এই সফরে খাদিজার বিশ্বস্ত দাস মাইসারা তাঁর সঙ্গী ছিলেন। নবীজি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং প্রচুর মুনাফা নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। মাইসারা সফরে নবীজির সততা, মহানুভবতা এবং কিছু অলৌকিক ঘটনা (যেমন প্রচণ্ড রোদে মেঘের ছায়া দেওয়া) প্রত্যক্ষ করেন এবং ফিরে এসে খাদিজাকে সব খুলে বলেন।
খাদিজা (রা.) নবীজির চরিত্র ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন। তিনি আগে অনেক কুরাইশ সর্দারের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কিন্তু এবার তিনি নিজেই বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনিয়ার মাধ্যমে নবীজির কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। নবীজি তাঁর চাচা আবু তালিব এবং হামযার সাথে পরামর্শ করে এই প্রস্তাবে সম্মতি জানান।
বিয়ের সময় নবীজির বয়স ছিল ২৫ বছর এবং খাদিজা (রা.) এর বয়স ছিল ৪০ বছর। খাদিজা ছিলেন বিধবা এবং দুই সন্তানের জননী। তবুও নবীজি তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। আবু তালিব এই বিয়ে পড়ান এবং ৫০০ দিরহাম মোহরানা ধার্য করা হয়।
তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল ২৫ বছরের। এটি ছিল এক আদর্শ দাম্পত্যের নিদর্শন। যতদিন খাদিজা (রা.) বেঁচে ছিলেন, নবীজি দ্বিতীয় কোনো বিয়ে করেননি। খাদিজা ছিলেন নবীজির কেবল স্ত্রী নন, তিনি ছিলেন তাঁর সবচেয়ে ভালো বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং বিপদের সাথী।
নবুওয়াত লাভের পর যখন নবীজি হেরা গুহায় জিবরাঈল (আ.)-কে দেখে ভীত হয়ে ঘরে ফিরলেন, তখন খাদিজাই তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহ আপনাকে কখনও অপমানিত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, সত্য কথা বলেন, অসহায়ের সাহায্য করেন এবং মেহমানের আপ্যায়ন করেন।' তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি নবীজির ওপর ঈমান আনেন।
তাঁদের ঘরে ছয়জন সন্তান জন্মগ্রহণ করেন — দুই পুত্র (কাসিম ও আব্দুল্লাহ) এবং চার কন্যা (জয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা)। পুত্ররা শৈশবেই মারা যান, যা নবীজির জন্য ছিল এক বিরাট পরীক্ষা। শত্রুরা তাঁকে 'নির্বংশ' (আবতার) বলে উপহাস করত, যার জবাবে আল্লাহ সূরা কাউসার নাযিল করেন।
খাদিজা (রা.) তাঁর সমস্ত সম্পদ ইসলামের সেবায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন। শি'বে আবি তালিবের বন্দিজীবনে তিনি নবীজির সাথে অমানবিক কষ্ট সহ্য করেন। তাঁর মৃত্যুর পর নবীজি প্রায়ই তাঁর কথা স্মরণ করে কাঁদতেন এবং তাঁর বান্ধবীদের উপহার পাঠাতেন। আয়েশা (রা.) একবার বলেছিলেন, 'আমি খাদিজা ছাড়া অন্য কোনো নারীকে নিয়ে ঈর্ষা করিনি, যদিও আমি তাঁকে দেখিনি।'
প্রধান ব্যক্তিবর্গ
খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ
Khadijah bint Khuwaylid
নবীজির প্রথম স্ত্রী, প্রথম মুসলিম ও 'উম্মুল মুমিনিন'
মাইসারা
Maysara
খাদিজার দাস, যিনি ব্যবসায়িক সফরে নবীজির সঙ্গী ছিলেন
নাফিসা বিনতে মুনিয়া
Nafisa bint Munya
ঘটক, যিনি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন
আবু তালিব
Abu Talib
নবীজির চাচা, যিনি বিয়ের খুতবা পাঠ করেন
📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
নবীজি ও খাদিজা (রা.) এর বিবাহ
খাদিজা (রা.) এর ইন্তেকাল (নবুওয়াতের ১০ম বছর)
💡 শিক্ষা ও উপদেশ
- চরিত্রই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ — সততার কারণেই খাদিজা (রা.) নবীজিকে পছন্দ করেছিলেন।
- পারিবারিক জীবনে স্ত্রী কেবল জীবনসঙ্গী নন, তিনি পরামর্শদাতা ও বন্ধুও হতে পারেন।
- নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা — খাদিজা (রা.) নিজেই ব্যবসার মালিক ছিলেন এবং নিজের বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
- বিপদের সময় সঙ্গীকে সাহস যোগানো।
📜 কুরআনের রেফারেন্স
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ ○ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ○ إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ
নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি। তাই তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো। নিশ্চয়ই তোমার বিদ্বেষ পোষণকারীই নির্বংশ।
— সূরা কাউসার ১০৮:১-৩
وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَىٰ
তোমাকে অভাবগ্রস্ত পেয়ে তিনি সচ্ছল করেছেন।
— সূরা দুহা ৯৩:৮ (তাফসিরকারকদের মতে এখানে খাদিজার সম্পদের মাধ্যমে সচ্ছলতার ইঙ্গিত রয়েছে)