ইতিহাসে ফিরে যান
🏜️ জাহিলিয়া যুগ~500-610 CE

নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর জন্ম

Birth of Prophet Muhammad ﷺ

570 CE

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

রবিউল আউয়াল মাসে মক্কায় কুরাইশ বংশের হাশিমী গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আব্দুল্লাহ জন্মের আগেই মারা যান। মা আমিনা ৬ বছর বয়সে মারা যান।

গুরুত্ব ও তাৎপর্য

সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর আগমন — সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত।

📖 বিস্তারিত ইতিহাস

৫৭০ খ্রিস্টাব্দে হাতির বছরে (আমুল ফীল), ১২ই রবিউল আউয়াল, সোমবার ভোরবেলায় মক্কার কুরাইশ বংশের হাশিমী শাখায় সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং মাতার নাম আমিনা বিনতে ওয়াহাব। আব্দুল্লাহ ছিলেন কুরাইশের সবচেয়ে সুন্দর যুবক — তাঁকে বিয়ে করার জন্য অনেক নারী প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি আমিনাকেই বিয়ে করেন।

নবীজির জন্মের আগেই তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ সিরিয়ায় (মতান্তরে মদীনায়) বাণিজ্য সফরকালে অসুস্থ হয়ে মদীনায় (ইয়াসরিবে) ইন্তেকাল করেন। তখন আমিনা গর্ভবতী ছিলেন। অর্থাৎ নবীজি পিতৃহারা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন — এটি ছিল আল্লাহর বিশেষ পরিকল্পনা, যাতে পরবর্তীতে কেউ বলতে না পারে যে তিনি পিতার প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যবহার করে নবুওয়াত দাবি করেছেন। আব্দুল্লাহ রেখে যান সামান্য কিছু সম্পদ — পাঁচটি উট, একপাল ছাগল এবং উম্মে আইমান নামে একজন আবিসিনীয় দাসী।

জন্মের সময় অনেক অলৌকিক নিদর্শন প্রকাশিত হয় বলে বর্ণিত আছে — পারস্য সম্রাটের রাজপ্রাসাদের ১৪টি স্তম্ভ কেঁপে ওঠে, সাভা হ্রদের পানি শুকিয়ে যায়, পারস্যের অগ্নিমন্দিরের হাজার বছরের পবিত্র আগুন নিভে যায়। এই বর্ণনাগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, এগুলো নবীজির আগমনের যুগান্তকারী তাৎপর্যকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরে।

জন্মের পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং নবজাতককে কাবায় নিয়ে গিয়ে আল্লাহর কাছে শোকর আদায় করেন। তিনি শিশুর নাম রাখেন 'মুহাম্মাদ' — অর্থ 'প্রশংসিত'। এই নাম আরবে তখন পর্যন্ত প্রচলিত ছিল না — আব্দুল মুত্তালিব বলেন, 'আমি চাই আকাশে ও পৃথিবীতে সে প্রশংসিত হোক।' মা আমিনা তাঁর নাম রাখেন 'আহমাদ'। আল্লাহর অপার কুদরত — ঈসা (আ.) বনী ইসরাইলকে বলেছিলেন, 'আমার পরে একজন রাসূল আসবেন যার নাম হবে আহমাদ' (সূরা সফ ৬১:৬)।

আরবের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শিশুদের মরুভূমির বেদুইন পরিবারে পাঠানো হতো — এতে শিশু স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠে, বিশুদ্ধ আরবি শেখে এবং কঠোর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়। কিন্তু নবীজিকে কেউ নিতে চাইল না — কারণ তিনি ছিলেন এতিম, এবং ধাত্রীরা ভাবলো যে এতিমের পরিবার থেকে ভালো পারিশ্রমিক পাওয়া যাবে না। অবশেষে বনু সা'দ গোত্রের হালিমা সা'দিয়া তাঁকে নেন — তিনিও প্রথমে দ্বিধান্বিত ছিলেন, কিন্তু আর কোনো শিশু না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে না চেয়ে নবীজিকে নেন।

হালিমার ঘরে নেওয়ার পর থেকে তাঁর পরিবারে অভাবনীয় বরকত দেখা দেয়। তাঁর শুকনো উটনী হঠাৎ দুধে ভরে যায়, তাঁর জমি সবুজ হয়ে ওঠে, পশুপাল মোটাতাজা হয়। প্রতিবেশীরা বিস্মিত হয়ে বলতো, 'হালিমা কী রকম ভাগ্যবান শিশু পেয়েছে!' হালিমা নবীজিকে এতটাই ভালোবাসতেন যে দুধ ছাড়ানোর পরও তাঁকে ফেরত দিতে চাননি। দুই বছর পর আমিনার কাছে ফেরত দেওয়ার পর, হালিমা আবার আমিনাকে অনুরোধ করেন নবীজিকে আরও কিছুদিন রাখতে — এবং আমিনা রাজি হন।

হালিমার ঘরে থাকার সময়ই ঘটে 'শাক্কুস সদর' (বক্ষ বিদীর্ণ) এর ঘটনা। দুইজন ফেরেশতা (জিবরাঈল ও মিকাঈল) আসেন, নবীজির বুক খুলে তাঁর হৃদয় থেকে শয়তানের অংশ বের করে জমজমের পানিতে ধুয়ে আবার রেখে দেন। এই ঘটনা দেখে হালিমা ভয় পেয়ে নবীজিকে আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। অনেক আলেমের মতে, এই ঘটনা নবীজিকে সকল প্রকার পাপ ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে পবিত্র রাখার জন্য আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থা ছিল।

৬ বছর বয়সে মা আমিনা নবীজিকে নিয়ে মদীনায় (ইয়াসরিবে) পিতার কবর জিয়ারত করতে যান এবং সেখানে তাঁর মামার বাড়িতে (বনু নাজ্জার গোত্র) এক মাস অবস্থান করেন। ফেরার পথে 'আবওয়া' নামক স্থানে মা আমিনা অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন। ৬ বছরের শিশু মুহাম্মাদ এখন পিতামাতা উভয়হারা — সম্পূর্ণ এতিম। দাসী উম্মে আইমান তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন। এরপর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন এবং অত্যন্ত স্নেহে তাঁকে বড় করতে থাকেন।

কিন্তু ৮ বছর বয়সে দাদা আব্দুল মুত্তালিবও ইন্তেকাল করেন। এবার চাচা আবু তালিব তাঁর অভিভাবকত্ব নেন। আবু তালিব অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ছিলেন না — তাঁর পরিবারে অনেক সন্তান ছিল — কিন্তু তিনি নবীজিকে নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। ১২ বছর বয়সে আবু তালিবের সাথে সিরিয়ায় বাণিজ্য সফরে যান। পথে বুসরা নামক স্থানে খ্রিস্টান পাদ্রী বাহিরা (মূল নাম জর্জিস) নবীজিকে দেখে তাঁর মধ্যে শেষ নবীর চিহ্ন (কাঁধের সিলমোহর — 'খাতামুন নুবুওয়াহ') শনাক্ত করেন এবং আবু তালিবকে সতর্ক করেন যে এই শিশুকে ইহুদি ও রোমানদের থেকে সাবধানে রাখতে হবে।

যৌবনে মুহাম্মাদ (সা.) মক্কায় 'আল-আমীন' (বিশ্বস্ত) ও 'আস-সাদিক' (সত্যবাদী) নামে পরিচিত হন। তিনি কখনো মদ পান করেননি, মূর্তিপূজা করেননি, মিথ্যা বলেননি, কারো ক্ষতি করেননি। মক্কায় 'হিলফুল ফুযুল' নামে একটি যুবক সংগঠনে তিনি যোগ দেন — যার উদ্দেশ্য ছিল নির্যাতিতদের সাহায্য করা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। নবুওয়াত প্রাপ্তির পরও তিনি বলেছিলেন: 'এই চুক্তির জন্য আমাকে আবার ডাকা হলে আমি অবশ্যই যোগ দিতাম।' ২৫ বছর বয়সে ৪০ বছর বয়স্কা বিধবা ব্যবসায়ী খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদের ব্যবসার হিসাব রক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। খাদিজা তাঁর সততা ও বিশ্বস্ততায় মুগ্ধ হয়ে বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। বিবাহের পর তাঁদের সংসার অত্যন্ত সুখের ছিল।

প্রধান ব্যক্তিবর্গ

আমিনা বিনতে ওয়াহাব

Aminah bint Wahb

নবীজির মা, বনু জুহরা গোত্রের কন্যা, আবওয়ায় ইন্তেকাল করেন

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব

Abdullah

নবীজির পিতা, জন্মের আগেই মদীনায় ইন্তেকাল করেন

হালিমা সা'দিয়া

Halimah al-Sa'diyyah

বনু সা'দ গোত্রের দুধমা, ৪-৫ বছর নবীজিকে লালন-পালন করেন

আবু তালিব ইবনে আব্দুল মুত্তালিব

Abu Talib

নবীজির চাচা ও প্রধান অভিভাবক, আজীবন নবীজিকে রক্ষা করেন

উম্মে আইমান (বারাকাহ)

Umm Ayman

আবিসিনীয় দাসী, মায়ের মৃত্যুর পর নবীজিকে মক্কায় নিয়ে আসেন

📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ

৫৭০ CE, ১২ রবিউল আউয়াল

সোমবার ভোরে নবীজি (সা.) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন

৫৭৪ CE

হালিমার ঘরে 'শাক্কুস সদর' (বক্ষ বিদীর্ণ) ঘটনা ঘটে

৫৭৬ CE

মা আমিনা আবওয়ায় ইন্তেকাল করেন, নবীজি সম্পূর্ণ এতিম হন

৫৭৮ CE

দাদা আব্দুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করেন, চাচা আবু তালিব অভিভাবক হন

৫৮২ CE

আবু তালিবের সাথে সিরিয়া সফর, পাদ্রী বাহিরার সাক্ষাৎ

~৫৯০ CE

'হিলফুল ফুযুল' যুবক সংগঠনে যোগদান

৫৯৫ CE

খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদকে বিয়ে করেন

💡 শিক্ষা ও উপদেশ

  • এতিম হিসেবে বেড়ে ওঠা আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল — এতে নবীজি দুঃখী মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখেছেন।
  • আল্লাহ তাঁর নবীকে জন্ম থেকেই পাপমুক্ত ও শয়তানের প্রভাবমুক্ত রেখেছিলেন।
  • সততা ও বিশ্বস্ততা — এই গুণাবলী নবুওয়াতের আগেই নবীজিকে সর্বজনশ্রদ্ধেয় করে তুলেছিল।
  • প্রতিটি কষ্ট ও পরীক্ষা আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ — ধৈর্য ধরলে আল্লাহ উত্তম বিনিময় দেন।

📜 কুরআনের রেফারেন্স

أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ ○ وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَىٰ ○ وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَىٰ

তিনি কি তোমাকে এতিম পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন। তোমাকে পথহারা পেয়ে পথ দেখিয়েছেন। তোমাকে অভাবগ্রস্ত পেয়ে সচ্ছল করেছেন।

সূরা দুহা ৯৩:৬-৮

وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ

আমি তোমার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি।

সূরা ইনশিরাহ ৯৪:৪