প্রকাশ্য দাওয়াত শুরু
Public Preaching Begins
সংক্ষিপ্ত বিবরণ
সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেন। আবু লাহাব তাঁর বিরোধিতা করে। কুরাইশদের কঠোর বিরোধিতা শুরু হয়।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
সত্যের পথে দৃঢ়তা — প্রতিকূলতার মুখেও দাওয়াত অব্যাহত।
📖 বিস্তারিত ইতিহাস
তিন বছর গোপন দাওয়াতের পর, যখন মুসলিমদের ঈমান ও মনোবল যথেষ্ট মজবুত হলো, তখন মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে প্রকাশ্যে সত্য প্রচারের নির্দেশ দিলেন। সূরা হিজরের ৯৪ নম্বর আয়াতে বলা হলো: 'তোমাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা প্রকাশ্যে প্রচার করো এবং মুশরিকদের বর্জন করো।' এই নির্দেশ পাওয়ার পর নবীজি (সা.) আর বসে থাকলেন না।
একদিন তিনি সাফা পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করলেন এবং মক্কার তৎকালীন বিপদ সংকেত 'ইয়া সাবাহাহ' (হায় সকালের বিপদ!) বলে চিৎকার দিলেন। এই ডাক শুনে কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্র ছুটে এল। কেউ আসতে না পারলে প্রতিনিধি পাঠাল। নবীজি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'আমি যদি বলি এই পাহাড়ের পেছনে একদল শত্রু তোমাদের আক্রমণ করতে ওঁত পেতে আছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?' সবাই সমস্বরে বলল, 'অবশ্যই, আমরা তোমাকে কখনোই মিথ্যা বলতে শুনিনি। তুমি তো আল-আমিন।' তখন নবীজি বললেন, 'তবে আমি তোমাদের এক আসন্ন কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করছি। তোমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো, তাহলে সফলকাম হবে।'
এই কথা শুনে মুহূর্তে পরিবেশ বদলে গেল। যে মানুষটিকে তারা একটু আগেই সত্যবাদী বলল, এখন তাঁকেই তারা শত্রু ভাবতে শুরু করল। নবীজির চাচা আবু লাহাব ক্ষিপ্ত হয়ে পাথর হাতে নিয়ে বলল, 'ধ্বংস হও তুমি! এ জন্যই কি আমাদের ডেকেছ?' এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ 'সূরা লাহাব' নাযিল করেন, যেখানে আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ধ্বংসের সংবাদ দেওয়া হয়।
এরপর থেকে শুরু হয় সংঘাতের এক নতুন অধ্যায়। কুরাইশরা প্রথমে নবীজিকে থামানোর জন্য আপস প্রস্তাব দেয়। তারা বলে, 'আমরা তোমাকে আরবের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি বানিয়ে দেব, সবচেয়ে সুন্দরী নারী বিয়ে দেব, এমনকি আমাদের নেতা বানিয়ে নেব—শুধু তুমি এই নতুন ধর্মের কথা বলা বন্ধ করো।' নবীজি তা প্রত্যাখ্যান করে চাচা আবু তালিবকে বলেন, 'চাচা, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদও এনে দেয়, তবুও আমি এই দ্বীন প্রচার থেকে বিরত হবো না। হয় আল্লাহ এই দ্বীনকে বিজয়ী করবেন, নয়তো আমি এই পথে ধ্বংস হবো।'
প্রলোভনে কাজ না হওয়ায় কুরাইশরা নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। নবীজি যখন কাবার চত্বরে সেজদায় যেতেন, তখন উকবা বিন আবি মুআইত উটের পচা নাড়িভুঁড়ি তাঁর পিঠের ওপর চাপিয়ে দিত। তাঁর গলায় চাদর পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করা হতো। রাস্তায় কাঁটা পুঁতে রাখা হতো। তাঁকে জাদুকর, পাগল ও কবি বলে উপহাস করা হতো। কিন্তু নবীজি ছিলেন পর্বতের মতো অটল।
এই প্রকাশ্য দাওয়াতের ফলেই ইসলামের কথা মক্কার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। হযরত হামজা (রা.) এবং হযরত উমর (রা.)-এর মতো বীরদের ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তারা প্রকাশ্যে কাবার সামনে নামাজ পড়ার সাহস পায়।
নবীজি হজ্জের মৌসুমে মক্কায় আগত বিভিন্ন গোত্রের তাঁবুতে গিয়ে দাওয়াত দিতে থাকেন। মিনার বাজারে, মেলায় গিয়ে তিনি বলতেন, 'হে লোকসকল! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো, সফলকাম হবে।' আবু লাহাব তাঁর পিছু পিছু গিয়ে বলতো, 'এ পাগল, তোমরা এর কথা শুনো না।' কিন্তু সত্যের আলো এভাবেই আরবের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
প্রধান ব্যক্তিবর্গ
আবু লাহাব
Abu Lahab
নবীজির চাচা ও কট্টর বিরোধী, যার নামে সূরা নাযিল হয়েছে
আবু তালিব
Abu Talib
নবীজির রক্ষক, যিনি আমরন কুরাইশদের চাপ থেকে তাঁকে বাঁচিয়েছেন
ওলিদ ইবনে মুগিরা
Walid ibn Mughira
কুরাইশ সর্দার, যে নবীজিকে জাদুকর বলার পরামর্শ দিয়েছিল
📅 গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
সাফা পাহাড়ে প্রকাশ্য দাওয়াত ও সংঘাতের শুরু
💡 শিক্ষা ও উপদেশ
- সত্যের পথে বাধা আসবেই, তা মোকাবিলা করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকা চাই।
- আপসহীনতা — নীতির প্রশ্নে কোনো দুনিয়াবী লোভে পড়া যাবে না।
- যুক্তিনির্ভর দাওয়াত — নবীজি প্রথমে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করেছেন, তারপর দাওয়াত দিয়েছেন।
- বিরোধিতার মাধ্যমেই সত্যের প্রচার আরও ত্বরান্বিত হয়।
📜 কুরআনের রেফারেন্স
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
তোমাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা প্রকাশ্যে প্রচার করো এবং মুশরিকদের বর্জন করো।
— সূরা হিজর ১৫:৯৪
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ
ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।
— সূরা লাহাব ১১১:১